ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৮, ২০ সফর ১৪৪৩

আদালতের সুযোগ নেই দেনমোহর মওকুফের


প্রকাশ: ১১ মার্চ, ২০২১ ১১:০৫ পূর্বাহ্ন


আদালতের সুযোগ নেই দেনমোহর মওকুফের

বিএন নিউজ ডেস্ক : ইসলামে বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেনমোহর; যা ব্যতিরেকে কোন বিয়ে বৈধ হতে পারে না। তাই স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা স্বামীর ওপর ফরজ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “হে নবী! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদেরকে যাদের দেনমোহর তুমি প্রদান করেছ।” (সুরাঃ আল-আহজাব, আয়াত-৫০)।

 এছাড়াও একটি হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তি কোনো মেয়েকে দেনমোহর দেওয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে কিন্তু তা দেওয়ার ইচ্ছে নেই; সে কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট ব্যাভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।” (মুসনাদে আহমাদ)

যদিও দেনমোহরের সর্বোচ্চ পরিমাণ কত হবে তা কোথাও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে হানাফি মাজহাবের নূন্যতম পরিমাণ ১০ দিরহাম বা ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা বা সমপরিমাণ অর্থ। এর থেকে কম পরিমাণ অর্থ ধার্য করা হলে এবং স্ত্রী তাতে সম্মত হলেও শরিয়তে তা বৈধ হবে না। তাই স্বামীর কর্তব্য নিজ সামর্থ্য এবং স্ত্রীর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে উভয় পক্ষের সম্মতিতে দেনমোহর ধার্য করা। এটি মূলত কম ধার্য করাই মুস্তাহাব। তবে বিয়েতে যদি দেনমোহর ধার্য করা না হয়, সেক্ষেত্রে স্ত্রী তার যোগ্যতার ভিত্তিতে মোহরানা পাওয়ার অধিকারী হবেন।

দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার এবং স্বামীর পরিশোধযোগ্য একটি আইনগত দায়। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশে দেনমোহর প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রী চাহিবামাত্র তা সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। দেনমোহর মূলত আশু ও বিলম্বিত দুই পদ্ধতিতে পরিশোধ করা যায়। আশু দেনমোহর বিয়ের আসরেই স্ত্রীকে প্রদান করতে হয়। 

তবে তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে না পারলে দাম্পত্য জীবন চলাকালীন সময়ে স্ত্রী চাহিবামাত্র স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। বিলম্বিত দেনমোহর সাধারণত স্বামীর মৃত্যুর পর অথবা তালাকের পর স্ত্রী পেয়ে থাকে। তবে দেনমোহর প্রাপ্তির অধিকারে বাঁধার সৃষ্টি হলে স্বামীর  মৃত্যু বা তালাকের দিন হতে তিন বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। অন্যথায় মামলা তামাদি হয়ে যাবে।

আমরা অনেক সময় দেখতে পাই বিয়েতে কনেকে দেওয়া বর পক্ষের শাড়ি, গহনা বা প্রসাধনীর মূল্য হিসাবে কাবিন নামায় দেনমোহরের একটি অংশকে উসুল ধরা হয়। যা কখনোই উচিত নয়। কারণ এসকল সামগ্রী কেবল স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেওয়া কিছু মূল্যবান সম্পদ; দেনমোহর আদায় নয়। এছাড়াও একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলেই কেবল দেনমোহর পরিশোধ করতে হয় অন্যথায় করতে হয় না। তবে আইনে কথাটির কোনো ভিত্তি নেই। 

কেননা দেনমোহর হলো বিয়ের শর্ত এর সাথে তালাকের কোনো সম্পর্ক নেই। তালাক স্বামী-স্ত্রীর যেই প্রদান করুক দেনমোহর পরিশোধ করা আবশ্যক। অন্যথায় স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারবেন। এমনকি সহবাসের আগে বা পরে স্ত্রী দেনমোহর দাবি করলে এবং স্বামী তা পরিশোধ না করলে স্ত্রী সহবাসে যেতেও অস্বীকার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে স্বামী দেনমোহর পরিশোধ ব্যতীত দাম্পত্য অধিকারের ডিক্রি পাবেন না।

তবে দাম্পত্য মিলন হওয়ার পূর্বে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্ত্রী অর্ধেক দেনমোহরের অধিকারী হবেন। এক্ষেত্রে সহবাস হয়েছিল কি না তা প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর। কিন্তু, স্বামী যদি দাম্পত্য মিলনের পূর্বে মারা যায় তাহলে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনানুসারে স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হবেন। তবে তালাক পরবর্তী দেনমোহর পরিশোধের পূর্বে স্বামীর মৃত্যু হলে তার জমাকৃত নগদ অর্থ বা প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকে স্বামীর স্বজনদের স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু, স্বামীর পূর্বে যদি স্ত্রীর মৃত্যু হয় ও দেনমোহর অপরিশোধিত থাকে সেক্ষেত্রে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা তা পাওয়ার অধিকারী হবেন এবং প্রয়োজনে মামলা করতে পারবেন। 

এক্ষেত্রে আদালতের কোনো সুযোগ নেই দেনমোহর মওকুফ করার। স্ত্রীর পূর্ণ সম্মতিতেই কেবল স্ত্রী নিজে আংশিক বা সম্পূর্ণ দেনমোহর মওকুফ করতে পারবেন। তবে নাবালক স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ অবৈধ। স্বামী চাইলে দেনমোহর বৃদ্ধি করতে পারবেন এবং নগদ অর্থ, বীমা-পলিসি, কোনো হালাল দ্রব্য বা সামগ্রীকে দেনমোহর হিসাবে ধার্য করা যাবে। দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন উভয় পক্ষের মধ্যে তা স্বীকৃত হলে স্বামী সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে বাধ্য। স্বামী যদি আর্থিক অসামর্থ্যও হয় তবুও আদালত তাকে দায় থেকে মুক্তি দিবে না।

শাহীন আলম
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।


   আরও সংবাদ